☀
চীনে ক্যান্টন বানিজ্য প্রথার বৈশিষ্ট, কারন এবং গুরুত্ব কী ছিল ?
ভূমিকা :-
আধুনিক যুগের আগে পর্যন্ত একমাত্র ক্যান্টন বন্দরের মধ্য দিয়েই চিন পাশ্চাত্য
দেশগুলির সঙ্গে একটি স্বনিয়ন্ত্রিত , রক্ষনশীল অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে
চেয়েছিল । ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে ২৯ আগষ্ট নানকিং এর সন্ধি আগে পর্যন্ত সমগ্র চীন বিদেশীদের
কাছে রুদ্ধ থাকলেও একমাত্র এই ক্যান্টন বন্দর ছিল বিদেশিদের কাছে উন্মুক্ত বন্দর। এইভাবে ক্যান্টন বন্দর কে কেন্দ্র করে চিনে বিদেশিদের এক বন্দর কেন্দ্রিক যে বাণিজ্য প্রথার সূচনা হয়, তা 'ক্যান্টন বাণিজ্য' প্রথা নামে পরিচিত।
বৈশিষ্ট :- চিনে ক্যান্টন বানিজ্যের কতকগুলো উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য দেখা যায় । এর মধ্যে
কয়েকটি উল্লেখযোঘ্য হল –
( ১ ) ক্যান্টন ছাড়া
চিনের অন্য কোন বন্দরে বিদেশীদের প্রবেশ বা ব্যবসা বাণিজ্যের কোন অধিকার ছিলো
না ।
( ২. ) একতরফা ক্যান্টন
বানিজ্যের দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যটি ছিলো " Onesided trade " অর্থাৎ
একতরফা বানিজ্য । এই বানিজ্যে চিনের কোন আগ্রহ ছিলো না । কিন্তু ইওরোপের বাজারে
অত্যন্ত লাভজনক চিনা দ্রব্যগুলি বিক্রির জন্য ইওরোপীয় বনিকরা ক্যান্টন বন্দরে
যেকোন রকম ঝুঁকি নিতে রাজি ছিলো ।
( ৩. ) পরোক্ষ বানিজ্য
ক্যান্টন বানিজ্যে ইওরোপীয় বনিকরা সরাসরি বা প্রত্যক্ষ ভাবে চিনের সঙ্গে
বানিজ্য করতে পারতো না ।
( ৪. ) " কো হং " সমবায়ের
অস্তিত্বে ইউরোপীয় বনিকদের সাথে বানিজ্য পরিচালনার জন্য চিনে ১৩ টি বনিক
সংস্থা নিয়ে " কো হং " গড়ে উঠেছিলো । এই " কো হং " এর মাধ্যমেই ইওরোপীয়
বনিকদের ক্যান্টন বানিজ্যে যাবতীয় কেনাবেচা চালাতে হতো ।
ক্যান্টন বানিজ্যের প্রেক্ষাপট :-
ক্যান্টন বন্দরকে কেন্দ্র করে চিনের " একবন্দর কেন্দ্রিক " বানিজ্যের পিছনে
বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারন ছিলো ।
( ১. ) বিদেশীদের সম্পর্কে চিনের ধারণা চিনারা বিদেশীদের কখনই তাদের সমকক্ষ
বলে মনে করতেন না । চিনারা নিজেদের দেশকে " স্বর্গের দেশ " বলে ডাকতো এবং মনে
করতো চিনের অভাব খুব সামান্যই । এই অভাব দূর করবার জন্য পররাষ্ট্রের সাথে
ব্যবসা বানিজ্য করবার কোন প্রয়োজন নেই । এই চিন্তাধারার জন্য প্রথম থেকেই চিন
পাশ্চাত্য দেশ গুলির সঙ্গে কোন রকম বানিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে অনীহা প্রকাশ
করে । কিন্তু পশ্চিমি দেশগুলির বার বার " দূত প্রেরন " এবং " নজরানা " প্রদানের
ফলে চিন কিছু শর্ত সাপেক্ষে ক্যান্টন বন্দরে বিদেশী বনিকদের বানিজ্যের অনুমতি
দেয় ।
( ২. ) ক্যান্টনের ভৌগলিক অবস্থান প্রথম দিকের পাশ্চাত্য দেশ গুলি ম্যাকাও,
সাংহাই প্রভৃতি বন্দরে বানিজ্যের সুযোগ পেলেও তারা ক্যান্টন বন্দরের
প্রতি উৎসাহী ছিলো । ক্যান্টন বন্দরের সহজ সমুদ্র যোগাযোগ ছিলো এর প্রধান কারন
। এই কারনে অন্যান্য বন্দর থেকে ক্যান্টনের আকর্ষণ ছিলো বেশি ।
( ৩ ) ক্যান্টন
বন্দরে চিনের আগ্রহ বিদেশীরা যেমন ক্যান্টন বন্দরে বানিজ্য করতে চেয়েছিলো ,
ঠিক তেমনি চিনও ক্যান্টনকে বিদেশীদের কাছে উন্মুক্ত রাখতে রাজী ছিলো । এর কারন
ছিলো ক্যান্টনে বিদেশীদের ওপর " নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ " দুটোই করা সহজ ছিলো ।
যেটা অন্যান্য বন্দরে করা কঠিন ছিলো ।
( ৪ ) ১৭৫৭ খ্রিঃ চিনা আদালতের ঘোষনা মাঞ্চু সরকার সিদ্ধান্ত নেয় , সকল বৈদেশিক
বানিজ্য শুধুমাত্র ক্যান্টন বন্দরের মাধ্যমেই পরিচালিত হবে । ইতিমধ্যেই এই
সিদ্ধান্তের অনুকূলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে । ১৭৫৯ খ্রিঃ জেমস ফ্লিট নামে এক
ইংরেজ বনিক জোর করে নিংপো বন্দরে প্রবেশ করলে , চিনা আদালত তাকে কারাদণ্ডে দন্ডিত
করে এবং আদেশ জারি করে , এখন থেকে বৈদেশিক বানিজ্য একমাত্র ক্যান্টন বন্দরের
মাধ্যমেই হবে । ক্যান্টন ছাড়া অন্য কোন বন্দরে বিদেশীরা প্রবেশ করতে পারবে না ।
এই নিষেধাজ্ঞা ১৮৪২ খ্রিঃ নানকিং -এর সন্ধির আগে পর্যন্ত বলবৎ ছিলো ।
নানকিং -এর সন্ধি :-
আফিম ব্যবসাকে কেন্দ্র করে চিন ও ইংল্যন্ডের মধ্যে সংঘটিত সংঘর্ষের ফলে
গঠিত এই সন্ধি ।
|
নানকিং -এর সন্ধি |
( ক ) চিন হংকং বন্দরটি
ইংল্যান্ডকে ছেড়ে দেয় ।
( খ ) ক্যান্টন , সাংহাই ,
অ্যাময় , ফুচাও , নিংগপো— এই পাঁচটি বন্দর ইউরোপীয়দের বাণিজ্য ও বসবাসের জন্য
খুলে দেওয়া হয় ।
( গ ) চিন ক্যান্টন বন্দরে
বাজেয়াপ্ত আফিমের মূল্য , কো - হো - কাছে প্রাপ্য অর্থ এবং যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ
বাবদ ২১,০০০০০০ ব্রিটিশ স্টালিং পাউন্ড দিতে বাধ্য হয় ।
( ঘ ) ‘ কো - হং ’ প্রথা
বাতিল হয় এবং চিনের সর্বত্র ইংরেজ বণিকদের পণ্য ক্রয়বিক্রয়ের অধিকার স্বীকৃত
হয় ।
টিয়েনসিনের সন্ধি বা চুক্তি :-
১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স চিনের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ সংঘটিত করে তা
দ্বিতীয় আফিমের যুদ্ধ নামে পরিচিত । এই যুদ্ধে চিন পরাজিত হয়ে ১৮৫৮
খ্রিস্টাব্দে জুন মাসে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের সাথে টিয়েনসিনের অসম চুক্তি
স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয় ।
|
টিয়েনসিনের সন্ধি বা চুক্তি |
এই সন্ধির শর্তগুলি ছিল —
( ক ) বিদেশি বণিকদের জন্য চিনকে আরো ১১ টি বন্দর খুলে দিতে হয় ।
( খ ) বিদেশিরা চিনের
যে কোনো জায়গায় ভ্রমণ ও বসবাসের অধিকার পায় ।
( গ ) আফিম ব্যবসাকে
আইনসম্মত করা হয় ।
( ঘ ) বিদেশি
ধর্মপ্রচারকরা চিনের সর্বত্র ধর্মপ্রচারের অধিকার পায় ।
( ঙ ) রাজধানী পিকিং -
এ বিদেশি দূতাবাস স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় ।
উপসংহার :-
আফিম ব্যবসাকে কেন্দ্র করে চিনের আদালতে ঘোষনার পর চিন ক্যান্টন
বন্দরসহ আরও অন্যান্য কয়েকটি বন্দর বৈদেশিকদের বানিজ্যের জন্য খুলে দিতে বাধ্য হয়
।